অবস্থান: লন্ডন, যুক্তরাজ্যদর্শনীয়: মেরিটাইম মিউজিয়াম, কুইন্স হাউজ, রয়্যাল অবজারভেটরি, গ্রেনিচ পার্ক, রোজ গার্ডেন
প্রধান আকর্ষণ: গ্রেনিচ মিন লাইন
দর্শনী: ফ্রি
সময়সূচী: সকাল ১০:০০ - বিকাল ৫:০০। পার্ক খোলা থাকে সকাল ৬:০০ - সূর্যাস্ত পর্যন্ত।
ওয়েবসাইট: http://www.nmm.ac.uk/
গ্যালারি: গ্রেনিচ পার্ক ও আশেপাশের এলাকার ছবির গ্যালারি
'জোটে যদি মোটে একটি পয়সা
খাদ্য কিনিও ক্ষুধার লাগি
দুটি যদি জোটে
অর্ধেকে ফুল
কিনে নিও হে অনুরাগী'
আমার কাছে এর ব্যাখ্যাটা হচ্ছে: মানুষের জৈবিক চাহিদাটা যখন মিটে যায় তখন সে নান্দনিক ব্যাপার নিয়ে চিন্তার অবকাশ পায়। ঠিক একইরকম ব্যাপার হয়েছিল গ্রেনিচ (অনেকে অবশ্য 'গ্রিনিচ' লিখেন, কিন্তু উচ্চারণ অনুযায়ী বানানটা হয় 'গ্রেনিচ') পার্কের ব্যাপারে। কাজের খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে আমরা গিয়ে পৌঁছাই গ্রেনিচ পার্কে। মজার ব্যাপার হচ্ছে তখনো পর্যন্ত আমরা জানি না যে গ্রেনিচ মানমন্দিরটা ওখানেই। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে আমরা আরো অনেকের দেখা পেলাম যারা বেশ কয়েকবছর ধরে লন্ডনে আছেন অথচ গ্রেনিচ পার্কের কথাই জানেন না।
প্রায় ১৮৩ একর জায়গা জুড়ে আছে এই পার্কটি এবং লন্ডনের সবচাইতে বড় পার্কগুলোর একটা হচ্ছে গ্রেনিচ। শুধু তাই নয়, ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদাও পেয়েছে এই পার্কটি। বহু ইতিহাসের সাক্ষী এই পার্কটি। বৃটিশ রাজ পরিবারের সাথে গ্রেনিচ পার্কের অনেকদিনের একটা যোগসূত্র আছে। পঞ্চম হেনরির সময়কাল থেকেই এই পার্কটা রাজপরিবারের সদস্যরা ব্যবহার করে আসছিলেন, মূলত হরিণ শিকারের জন্য। আমাদের অবশ্য ইতিহাস চাবানোর প্রয়োজন নেই এখানে, তার বদলে গ্রেনিচ পার্কের বিভিন্ন আকর্ষণ নিয়ে কথা বলা যাক।
কুইন্স হাউজ
প্রথম জেমস তার স্ত্রী 'এন'-কে মান ভাঙ্গানোর জন্য এই বাড়িটি উপহার দেন। শিকারের সময় রাণী এন জেমসের প্রিয় একটা কুকুরকে দূর্ঘটনাবশত মেরে ফেলেন। আর জেমস রাগে তখন রাণীকে সবার সামনে গালি দিয়ে বসেন। কিন্তু পরবর্তীতে সেই রাগ ভাঙ্গানোর জন্যই এই বাড়িটি তাকে উপহার দেয়া হয়। এই বাড়ির বিশেষত্ব হচ্ছে ঐতিহাসিক দিক দিয়ে। তখন পর্যন্ত সেরা সব বাড়ি বানানো হতো টিউডর ধাঁচে - লাল ইট দিয়ে, কিন্তু বাড়িটি বানানো হয় রেনেসাঁ ধাঁচে। আর এই কারনে বৃটেনের জন্য এই বাড়িটি ছিল যুগান্তকারী।
যাদের চিত্রকর্মের প্রতি আগ্রহ আছে তাদের জন্য এই বাড়িটি অবশ্যই দর্শনীয়। এছাড়াও কেউ কেউ বলেন যে কুইন্স হাউজে নাকি ভূতের দেখা পাওয়া যায়। তাই ভূতে যাদের বিশ্বাস আছে তারাও একবার চেষ্টা করে দেখতে পারেন যে ভূতের দেখা পাওয়া যায় কি না।
মেরিটাইম মিউজিয়াম
বৃটিশরা একসময় সারা পৃথিবী দখল করে নিয়েছিল এবং সেটা সম্ভব হয়েছিল জাহাজ-চালানোয় তাদের পারদর্শিতা এবং দক্ষতার কারনে। নৌ-পরিবহনের বিভিন্ন বিষয় নিয়েই মেরিটাইম মিউজিয়ামকে সাজানো হয়েছে।
আগের দিনে অভিযাত্রীরা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার জন্য নির্ভর করতো অক্ষাংশ (latitude) এবং দ্রাঘিমাংশের (longitude) হিসাবের ওপর। আর তাই কম্পাস, ক্রনোমিটার (chronometre) ছিল তাদের কাছে অপরিহার্য একটা জিনিস। মেরিটাইম মিউজিয়াম এই জিনিসগুলোর ওপরেই জোর দেয়া হয়েছে বেশি। এছাড়াও এখানে বিভিন্ন অভিযানের ওপর বেশ কিছু পেইন্টিং আছে।
রয়্যাল অবজারভেটরি
মেরিটাইম মিউজিয়াম আর কুইন্স হাউজের পেছনেই হচ্ছে গ্রেনিচ পার্ক। আর পার্কের মাঝখানে রয়েছে একটা পাহাড়, সেই পাহাড়ের ওপরেই পৃথিবীখ্যাত রয়্যাল অবজারভেটরি। ১৬৭৫ সালে দ্বিতীয় চার্লস এখানে রয়্যাল অবজারভেটরি স্থাপন করেন। একসময় জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের প্রাণকেন্দ্র ছিল এই গ্রেনিচ অবজারভেটরি এবং এখনো মেরিডিয়ান লাইন বা পূর্ব-পশ্চিম ভাগ করা লাইন চলে গেছে এই গ্রনিচের ওপর দিয়ে। বর্তমানে অবশ্য মূল অবজারভেটরি আর এখানে নেই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই সেটাকে ইস্ট-সাসেক্সে সরিয়ে নেয়া হয়।
এখানেও ছোট্ট একটা মিউজিয়াম আছে। মেরিটাইম মিউজিয়ামে জোর দেয়া হয়েছে নৌ-পরিচালনার বিভিন্ন বিষয়ের ওপর, কিন্তু এই মিউজিয়ামে জোর দেয়া হয়েছে জ্যোর্তিবিজ্ঞানের বিভিন্ন আবিষ্কারের ওপর। বিশেষ করে টেলিস্কোপের ওপর। একটা সময় ছিল যখন সমুদ্রে জাহাজ চালানোর জন্য বিভিন্ন গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান জানতে হতো (নাবিকদের এখনো অবশ্য এগুলো জানতে হয়)।
রয়্যাল অবজারভেটরির সবচাইতে বড় আকর্ষণ হচ্ছে গ্রেনিচ মিন লাইন (০০ দ্রাঘিমাংশ)। এই রেখাটা পৃথিবীকে পূর্ব এবং পশ্চিম এই দুই গোলার্ধে ভাগ করেছে। আর এটাই হচ্ছে পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় জায়গা। গ্রেনিচ মিন লাইনের ওপর দিয়ে এখানে একটি লাইন টানা আছে এবং পর্যটকরা এই লাইনের দুপাশে দুই পা রেখে ছবি তুলে নিয়ে যান। প্রেমিক-প্রমিকারা দুজন লাইনের দুপাশে দাড়িয়ে চুমু খাওয়ার ছবিও তুলে নেন স্মৃতি হিসেবে।
পিটার হ্যারিসন প্ল্যানেটরিয়াম আরেকটি বড় আকর্ষণ। প্লানেটরিয়াম শো দেখার জন্য চমৎকার সব আয়োজন রয়েছে এখানে। এখানে ডিজিটাল লেজার প্রজেক্টরের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে জ্যোর্তিবিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর শো দেখানো হয়। এই শো দেখার জন্য অবশ্য আলাদা টিকিট কাটতে হয় এবং টিকিটের দাম ৬ পাউন্ড।
বায়ো-ডাইভারসিটি বা জীব-বৈচিত্র্য
পার্কের ১৩ একর জায়গা জুড়ে জীব-বৈচিত্র্য নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়েছে। এখানে হরিণ, শেয়াল, বিভিন্ন ধরনের পাখি যাতে নিশ্চিন্তে বাস করতে পারে সেটা নিশ্চিত করে পার্ক কর্তৃপক্ষ। খুব সহজেই এখানে কাঠবেড়ালীর দেখা পাওয়া যায় এবং এরা আপনার সামনে দিয়ে লাফঝাঁপ দিয়ে যাবে প্রায়ই। তাই ক্যামেরায় এদের ছবি তুলে নিতে পারবেন অবলীলায়। পার্কের পেছনের দিকে কার পার্কের ডান দিকে একটু ভেতরের দিকে হেঁটে গেলে পাওয়া যাবে গোলাপের বাগান, একশ'রও বেশি প্রজাতির গোলাপ পাওয়া যাবে এখানে। কিন্তু গোলাপ দেখতে চাইলে সবচেয়ে ভালো সময় হচ্ছে এপ্রিল থেকে জুলাই-য়ের মাঝামাঝি।
কেনাকাটা
এখানে প্রায় প্রতিটি মিউজিয়ামেই গিফট শপ থাকে, এখানেও আছে। প্রচুর বইপত্র, খেলনা, টিশার্ট, ক্যাপ, টেলিস্কোপ, ঘড়িসহ বিভিন্ন জিনিস পাওয়া যাবে এখানে। তবে যারা সত্যি সত্যিই এ ধরনের গিফট কিনতে চান, তাদের জন্য পরামর্শ হচ্ছে মিউজিয়াম থেকে বের হয়ে ডিএলআর স্টেশনের দিকে যেতে একটা দোকান পাওয়া যাবে, সেখান থেকে একটু কম দামে একইরকম জিনিস কিনতে পারবেন।
