ওজন কমানোর কিছু টিপস

Printer-friendly versionSend to friendPDF version

ওজন কমানো দরকার, কিন্তু কেন?কখনো কি খেয়াল করে দেখেছেন যে আপনার পরিবারের কয়জন মানুষের ডায়াবেটিস অথবা হৃদরোগ আছে? আপনার বন্ধুবান্ধব বা অন্য যে কোন মানুষকে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে দেখুন, আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি সব পরিবারেই আপনি অন্তত একজন করে মানুষ পাবেন যার ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হাই-কোলস্টেরল ইত্যাদির যে কোন একটি বা একাধিক লক্ষণ আছে। আর এর সবগুলোর জন্য বিভিন্ন ধরনের কারন থাকলেও একটা সাধারন কারন হচ্ছে অতিরিক্ত ওজন। আপনার ওজন যদি প্রয়োজনের চাইতে বেশি হয় তখন শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঠিকমতো আর কাজ করতে পারে না, আর এর ফলে অদূর ভবিষ্যতে হার্ট অ্যাটাক, কিডনির সমস্যা, স্ট্রোক ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হতে পারে।

কতোটুকু ওজন কমানো দরকার?

শরীরের অনুপাতে ওজনের সম্পর্ক আছে, এই চার্ট থেকে একজন কতোখানি লম্বা তার অনুপাতে তার ওজন কতো হলে ঠিক হবে সেটা বের করা যাবে সহজেই। তথ্যসূত্র:'ফুড স্ট্যান্ডার্ড এজেন্সি'

প্রত্যেক মানুষের শরীরের অনুপাতে ওজনের একটা অনুপাত আছে। একে বডি-ম্যাস ইনডেক্স বা সংক্ষেপে বি.এম.আই. (BMI) বলে। সাধারনত ডায়েটিশিয়ান এবং নিউট্রশনিস্টরা এসব নিয়ে অনেক হিসেব নিকেশ করেন। আপনার জন্য অতো ঝামেলার দরকার নেই। ডানপাশের ছবিতে যে চার্টটি দেখতে পাচ্ছেন সেখান থেকে জেনে নিন যে আপনার ওজন প্রয়োজনের চাইতে বেশি কি না, আর বেশি হলে কতোটুকু। তারপর সেটুকু কমিয়ে ফেলার লক্ষ্য নিয়ে নতুন উদ্যমে ঝাপিয়ে পড়ুন।

ওজন কিভাবে কমানো যায়?

তার আগে জানা দরকার ওজন কিভাবে বাড়ে। সহজ প্রশ্ন, সবাই জানেন বেশি খেলে ওজন বাড়ে। আর তাই আমাদের শুরু করতে হবে আরেকটু আগে থেকে, আমাদের জন্য খাবার খাওয়াটা জরুরি কেন। আমরা খাবার খাই বেঁচে থাকার জন্য, কিন্তু আরো স্পষ্ট করে বললে আমরা খাবার থেকে শক্তি পাই। আমাদের শরীর গরম রাখা থেকে শুরু করে হৃদপিন্ড, কিডনি, ইত্যাদি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কাজ করা সবকিছুতেই শক্তির দরকার। আর এই শক্তিটাই আসে খাবার থেকে, তাই খাবার হচ্ছে এক অর্থে জ্বালানির মতো। আমরা যখন প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাই, তার মানে হচ্ছে বেশি পরিমানে জ্বালানি আমাদের শরীরে জমা হচ্ছে কিন্তু এটা খরচ হচ্ছে না। আর তখন এটা আমাদের শরীরে বাড়তি ওজন হিসেবে জমতে শুরু করে।

প্রচলিত একটা ধারনা হচ্ছে ওজন কমানোর সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হচ্ছে না খেয়ে থাকা। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে এতে আসলে উল্টো ফল হয়। তাই এখনকার নিউট্রিশনিস্ট ও ডায়েটিশিয়ানরা যেসব পরামর্শ দেন তার কিছু এখানে তুলে ধরা হলো:

খাবার খেতে হবে ঠিক অনুপাতে:আমরা যেসব খাবার খাই সেটাকে ডায়েটিশিয়ানরা সাধারনত পাঁচভাগে ভাগ করেন। প্রথম ভাগ হচ্ছে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা/শ্বেতসার জাতীয় খাবার। ভাত, রুটি, আলু, পাস্তা/নুডলস এর মধ্যে পরে। দ্বিতীয় ভাগে আছে শাক-সবজি ও ফলমূল। তৃতীয় ভাগে আছে প্রোটিন বা আমিষ, আর এর মধ্যে আছে মাছ, মাংস, ডাল, ডিম ইত্যাদি। এর পরের ভাগটা হচ্ছে ফ্যাট বা চর্বিজাতীয় ও চিনিজাতীয় খাবার। এরমধ্যে আছে তেল, মাখন, মেয়োনেজ, কোমল পানীয়, কেক, বিস্কিট, চকোলেট, ঘি, ইত্যাদি। আর সবশেষের ভাগটা হচ্ছে দুধজাতীয় খাবার। দুধ, দই, পনির, ছানা ইত্যাদি এর অন্তর্ভুক্ত।

খাবার সময় প্লেটে কোন ধরনের খাবার কোন অনুপাতে থাকবে সেটার ধারনা পাওয়া যাবে এই 'ইট ওয়েল' ডায়াগ্রাম থেকে। তথ্যসূত্র:'ফুড স্ট্যান্ডার্ড এজেন্সি'

এখন এই যে পাঁচ ধরনের খাবার, খাওয়ার সময় প্লেটে এদের পরিমানটা একটা অনুপাত অনুযায়ী থাকতে হবে। দেখেই নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে আমাদের খাবারের গলদটা কোথায়। আমরা ভাত (অথবা রুটি) খাই প্রচুর পরিমানে। মাছ, মাংস খাই অনেকখানি, কিন্তু শাক-সবজি, ফলমূল খাই না একেবারেই। তাই ওজন কমাতে হলে প্রথমেই খাবারের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে হবে। ভাত-রুটির পরিমান কমিয়ে এনে শাকসবজির পরিমান বাড়াতে হবে। রান্নার সময় অল্প তেল দিয়ে রান্না করতে হবে। মাছ মাংস খাওয়া কমাতে হবে।

তিনবেলা নিয়মিত খাবার খেতে হবে:আমরা সাধারনত তিনবেলা খাবার খেয়ে থাকি। সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার আর রাতের খাবার। এই তিনবেলার খাবার নিয়মিত খেতে হবে। অনেকেই সকালে উঠে দ্রুত কাজে চলে যান নাস্তা না করেই, এটা শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকর। কারন সারারাত না খেয়ে থাকার পর সকালে শরীরের জন্য শক্তির প্রয়োজন হয়, এবং নাস্তা থেকে শরীর সাধারনত সেই শক্তিটা পেয়ে থাকে। তাই সকালের নাস্তা বাদ দিলে দেখতে পাবেন যে সকাল থেকেই আপনার নিজেকে ক্লান্ত মনে হচ্ছে। এরপরে যেটা জরুরি ভিত্তিতে মনে রাখতে হবে সেটা হচ্ছে কোন বেলার খাবার বাদ দেয়া যাবে না এবং খাবারগুলো প্রত্যেকদিন নির্দিষ্ট সময়ে খেতে হবে। যেমন অনেকে কাজের চাপে দুপুরের খাবার খেতে সময় পান না। এর ফলে যেটা হয় পরবর্তীতে আপনি যখন খেতে যান, খুব বেশি ক্ষুধার কারনে আপনি প্রয়োজনের চাইতে বেশি খেয়ে ফেলেন। আর ফলে শরীরের ওজন বাড়তে থাকে। তাই ডায়েটিশিয়ানরা পরামর্শ দেন যে একবারে বেশি না খেয়ে কিছুক্ষণ পরপর অল্পস্বল্প করে কিছু খেতে। যেমন সকালে নাস্তা করার পর দুপুরের খাবারের আগে হালকা আরেকটু কিছু খেতে। তেমনি দুপুরের খাবার আর রাতের খাবারের মাঝামাঝি বিকেলে হালকা কিছু খেয়ে নিতে। কিন্তু সাবধান, এই নাস্তাগুলো হতে হবে স্বাস্থ্যকর। বিস্কিট বা কেক খেয়ে নাস্তা করলে কোন লাভ নেই। সবচেয়ে ভালো বুদ্ধি হচ্ছে একটা কলা, পেয়ারা, আপেল, কমলা বা এরকম কোন একটা ফল দিয়ে নাস্তা করা।

খাবারের বাটি টেবিলে নিয়ে আসবেন না: অনেক সময় দেখা যায় পেট ভরে গেছে, কিন্তু টেবিলে খাবারের বাটি থাকায় লোভে পরে আমরা আরেকটু প্লেটে তুলে নেই। এই বাড়তি খাবারটাও শরীরে জমা হতে থাকে সহজেই। তাই সহজ বুদ্ধি হচ্ছে যেটুকু আপনি সাধারনত খান সেটুকু রান্নাঘর থেকে প্লেটে তুলে নিয়ে খাবার টেবিলে আসুন। ফলে খাওয়া শেষে চাইলেও বাড়তি কিছু খাওয়ার সুযোগ থাকবে না।

শাক-সবজি, ফলমূল আর সালাদ খান বেশি করে:যখনই আমরা বলি যে ওজন কমানোর জন্য খাবারের পরিমান কমাতে হবে, সবারই একটা সাধারন প্রশ্ন থাকে যে তাহলে তো পেটে ক্ষুধা থেকে যাবে। আসলে আমরা যে পরিমান খাবার খাই তার বেশিরভাগটা থাকে ভাত অথবা মাছ-মাংস, যেটা বেশি ক্ষতিকর। তাই ভাত এবং মাছ মাংসের পরিমান কমিয়ে যদি সেটাকে শাক-সবজি আর সালাদ দিয়ে পূরন করেন, তাহলেও সেটা আপনার ওজন কমানোর ক্ষেত্রে অনেক সাহায্য করবে এবং একইসাথে পেটও ভর্তি রাখবে। কারন ভাত কিংবা মাছ-মাংসের তুলনায় শাক-সবজিতে ক্যালিরির পরিমান অনেক কম।

নিয়মিত ব্যায়াম করাটা জরুরি: আগেই বলা হয়েছে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাবার খেলে সেটা আমাদের শরীরে চর্বি হিসেবে জমা হতে থাকে। এর মূল কারন হচ্ছে প্রয়োজনের সময় শরীর এই চর্বি থেকে শক্তি পেয়ে থাকে। কোন প্রাণী যখন দিনের পর দিন খাবার যোগাড় করতে পারে না তখন তার চলার মতো শক্তি আসে এই চর্বি থেকে। আবার যখন বেশি পরিমানে শক্তির প্রয়োজন হয় তখনও শরীর এই চর্বি ভেঙ্গে শক্তি বের করতে শুরু করে। আর এই কারনেই ওজন কমানোর ভালো একটা পদ্ধতি হচ্ছে ব্যায়াম বা শরীর চর্চা করা। এখানে ব্যায়াম বলতে বলা হচ্ছে না যে প্রতিদিন জিমে গিয়ে বা পার্কে গিয়ে দৌড়ঝাপ করতে হবে। বরং অফিসে যাওয়ার সময় লিফটে না উঠে সিড়ি বেয়ে ওঠা, বাসায় যাওয়ার পথে বাস থেকে দুয়েক স্টপ আগে নেমে গিয়ে বাকিটা হেটে যাওয়া, অথবা রিকশায় ওঠার পরিবর্তে কিছুটা পথ হেটেই যাওয়া, এগুলো সবই ওজন কমাতে সাহায্য করবে। শুধু খেয়াল রাখতে হবে যে হাটার সময় যতোটা সম্ভব দ্রুত হাটতে হবে।

ওজন কমাতে হবে ধীরে ধীরে। সপ্তাহে আধকেজির বেশি ওজন কমানো ঠিক হবে না। আপনি যখন ওজন কমাতে শুরু করেন, সেটার সাথে ধাতস্থ হতে শরীরকে একটু সময় দিতে হয়। কিন্তু সেটা না করে যদি আপনি তাড়াহুড়ো করে ওজন কমানো শুরু করেন তাহলে শরীর শক্তি পাওয়ার জন্য তখন আপনার মাসল বা মাংসপেশী খরচ করা শুরু করে। ফলে আপনি খুব দ্রুত দূর্বল হয়ে পরবেন এবং অনেকসময় শরীরের উপকারের বদলে বড় ধরনের ক্ষতিও হয়ে যেতে পারে।

খাবারের অভ্যাসে পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে:খাবারের অভ্যাসে ধীরে ধীরে পরিবর্তন নিয়ে আসুন। একবারে বেশি পরিবর্তন আনতে গেলে কিছুদিন পরে আর মনের জোর বেশি থাকে না। তাই প্রথমে হয়তো ঠিক করুন যে বিকেলে বা সন্ধ্যায় যে পুরি, সিঙ্গারা ইত্যাদি তেলে ভাজা জিনিস খেতেন সেগুলো বাদ দিবেন। এরকম মাসখানেক চালানোর পর হয়তো ঠিক করলেন প্রত্যেক কাপ চায়ে দুই চামচ চিনির বদলে এক চামচ বা আধা চামচ চিনি খাবেন। এভাবে ধীরে ধীরে একটা একটা করে অভ্যাস গড়ে তুলোন।

মুখরোচক খাবার দাবার একেবারে কমিয়ে আনতে হবে:আমরা প্রতিদিন বিভিন্ন রকম মুখরোচক খাবার খেয়ে অভ্যস্ত। যেমন: সিঙ্গারা, পুরি, পেয়াজু। এর সাথে এখন আবার যোগ হয়েছে ফাস্ট ফুড: বার্গার, পিজ্জা, চিপস আর ফ্রাইড চিকেন। ডুবো তেলে ভাজা এই খাবারগুলোতে প্রচুর পরিমাণে তেল থাকে যা ওজন বাড়াতে খুব দ্রুত ভূমিকা রাখে।

মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে:আমাদের খাবারের অভ্যাসের ওপর মনের অনেকটা প্রভাব আছে। এ কারনেই অনেক সময় দেখা যায় আমাদের ক্ষুধা না থাকলেও লোভে পরে আমরা কিছু খেয়ে নেই। অনেকে আবার ওজন কমানোর জন্য খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেয়ার কারনে বিষণ্ণ হয়ে পরেন। তাই এসময় মানসিক সাপোর্ট পাওয়াটা জরুরি। কারন তা নাহলে কিছুদিন পরেই আপনি আবার সেই পুরনো খাবারের অভ্যাসে ফিরে যাবেন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো হয় যদি একই সাথে ওজন কমানোর ব্যাপারে আগ্রহী আরো কাউকে খুঁজে পান। এছাড়াও পরিবারের লোকজনের সহযোগিতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।


লেখক যুক্তরাজ্য প্রবাসী এবং সেখানে নিয়মিত ওজন নিয়ন্ত্রনের কোর্স পরিচালনা করেন। এছাড়াও তিনি ২০০৯ সালে এন.এইচ.এস-র একটা স্বল্পকালীন প্রজেক্টে ডায়াবেটিস প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন।