মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের নতুন প্রজন্মের অনেকেই এখন বিভ্রান্ত। আর তাদের দোষও নেই, কারণ এই জিনিসটাকে নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ভয়াবহরকম নোংরামিতে ব্যস্ত। সত্যটাকে রং মাখিয়ে কখনো আড়াল করে তারা নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী ব্যবহার করার চেষ্টা করছে সবসময়। আর ইতোমধ্যে সে সময়ে স্বাধীনতার বিপক্ষের একটা শক্তি ধর্মের আড়ালে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে এবং এখন চেষ্টা করছে সে সময়ে তাদের যে ভূমিকা সেটাকে মাটিচাপা দেয়ার। আর এতোকিছুর ভিড়ে নতুন প্রজন্ম আজ বিভ্রান্ত, তারা চিন্তা করছে কার কথা ঠিক। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মুল দুইটি দলের কাঁদা ছোড়াছুড়িতে মাঝখান থেকে সুবিধা নিয়ে নিচ্ছে স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তিরা।
নতুন প্রজন্মের যারা সচেতন এবং রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির বাইরে বেরিয়ে এসে নতুন কিছু করতে চাচ্ছেন, তারা আজ জানতে চান মুক্তিযুদ্ধের আসল ঘটনাটা কি ঘটেছিল আর সেখানে কার ভূমিকা কতোটুকু ছিল। প্রতিটি দলীয় বিবৃতিতে যে অতিরঞ্জনটুকু আছে সেটুকু ছেটে ফেলে সত্যটুকু জানার আগ্রহ তাদের অনেক। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যারা সত্যিকারের ভূমিকা রেখেছেন মুক্তিযুদ্ধে তারা পরবর্তীতে অনেকেই এই দুই দলের সাথে জড়িত হয়ে তাদের আদর্শকে বিকিয়ে মূল ঘটনাকে বিকৃত করেছেন। আর বাকি যারা ছিলেন তারা সবসময়েই রয়ে গেছেন পর্দার অন্তরালে এবং পরবর্তীতে দারিদ্র্য, অসুস্থ্যতা ইত্যাদি বিভিন্ন কারনে হারিয়ে গেছেন কালের গহবরে।
কিন্তু তারপরেও যেটা রয়ে গেছে সেটা হচ্ছে কিছু দলিলপত্র। প্রথমত 'মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র' স্বাধীনতার সময় যারা প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন তাদের অনেকের সাক্ষাৎকার সযত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছে। এই প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা যেমন আছেন, তেমনি আছেন গ্রামের সাধারন মানুষও। তারা রাজনৈতিক দিক থেকে কোন ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেন নাই, তারা শুধু বলেছেন সে সময় যেসব জিনিস তারা দেখেছেন। আর তাদের এই বিবৃতির মধ্য দিয়েই বের হয়ে আসে সেসময়ের ইতিহাস।
দ্বিতীয়ত, সে সময়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বাংলাদেশের ওপর বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও এখানকার মার্কিন দূতাবাসের সাথে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন এবং পররাষ্ট্র দপ্তরের যেসব চিঠি ও টেলিগ্রাম চালাচালি হচ্ছিল তার অনেক কিছুই সম্প্রতি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। এগুলো সে সময়কার সত্যি ঘটনা বের করে আনার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এবং এগুলোকে সাবধানতার সাথে বিশ্লেষণ করলে তখনকার নিরপেক্ষ ইতিহাসকে আবার আলোতে নিয়ে আসা যাবে সহজেই।
আরেকটি সহজ উপায় হচ্ছে 'প্রোফাইল অফ বেঙ্গল' ওয়েবসাইটে ঘুরে আসা। এই ওয়েবসাইটটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বড় একটা উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে, আর সেটা হচ্ছে বাংলাদেশের আদিযুগ থেকে শুরু করে ভবিষ্যত পর্যন্ত বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দেয়া। আর সেই লক্ষ্যে স্বাভাবিকভাবেই মুক্তিযুদ্ধের ওপর বেশ বড় একটা অংশ রয়েছে এখানে। পূর্ব এবং পশ্চিম মিলে বঙ্গ দেশের অস্তিত্ব অনেক দিন ধরে, কিন্তু ৭১'র স্বাধীনতার পরেই বাঙালীদের স্বাধীন সত্তা হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ একটা বড় ঘটনা। ধর্মনিরপেক্ষ এবং সহিষ্ণু জাতি হিসেবে বাঙ্গালীর বিকশিত হওয়ার যে সম্ভাবনা তখন দেখা দিয়েছিল সেটা পরবর্তীতে বিভিন্নভাবে বিঘ্নিত করা হয়েছে এবং এটি এখনো আমাদের উন্নয়নের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে যাচ্ছে। কিন্তু সেটা যাই হোক, আমাদের মূল আলোচনার প্রসঙ্গ মুক্তিযুদ্ধের ওপর সঠিক দলিলপত্রের সন্ধান করা, আর সেটা পাওয়া যাবে এই 'প্রোফাইল অফ বেঙ্গল' সাইটটি থেকে। এখানে ১৯৬৫ সালে আইয়ুবের ক্ষমতা গ্রহনের পর থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের দলিলপত্র রয়েছে। এসবের মধ্যে সে সময়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত 'মর্নিং নিউজ'-র বিভিন্ন খবর, যুদ্ধের সময় এবং আগে পরে মার্কিন দূত এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন এবং পররাষ্ট্র দপ্তরের সাথে চালাচালি হওয়া বিভিন্ন চিঠিপত্র এবং টেলিগ্রাম ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও 'মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র' মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকের সাক্ষাৎকারও রয়েছে এই ওয়েবসাইটে। এসব সাক্ষাৎকারে অনেক জায়গাতেই বের হয়ে এসেছে যে রাজাকাররা এবং তাদের দোসররা পরবর্তীতে কিভাবে সমাজে জায়গা করে নিয়েছেন।
এই ওয়েবসাইটটি নিষ্ঠার সাথে হোস্ট করছেন মঈদুল হাসান, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় তাজউদ্দিন আহমেদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে তিনি কাজ করেছেন। তার লেখা বই "মূলধারা '৭১"-এ সে সময়ের বিভিন্ন দিক ধারাবাহিকভাবে তিনি তুলে ধরেছেন। সেই বইটিও এই ওয়েবসাইটে তুলে ধরা হয়েছে, ফলে যারা এখনো বইটি পড়ার সুযোগ পাননি, এই সুযোগে তারা সেটি পড়ে ফেলতে পারেন।
